ভুবন মুসাফির: রাজনীতিতে কোনো দলের উত্থান যেমন নানা কারণে ঘটে, তেমনি পতনের পেছনেও থাকে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ। রাষ্ট্রযন্ত্রের পেশিশক্তির অপব্যবহার, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংবাদিকদের অতিরিক্ত আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে দলীয় প্রচার-প্রচারণায় ব্যবহার—এই তিনটি বিষয় একটি রাজনৈতিক দলের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব প্রবণতা বারবার আলোচনায় এসেছে।
১. রাষ্ট্রযন্ত্রের পেশিশক্তির অপব্যবহার: রাষ্ট্রযন্ত্রকে পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহার করলে সরকার ধীরে ধীরে জনগণের সমর্থন হারাতে থাকে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার টিকে থাকে জনগণের ভালোবাসা, আস্থা ও সম্মতির ওপর। কিন্তু কোনো সরকার যখন জনসমর্থন হারিয়ে ফেলে, তখন অনেক সময় ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগ রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান যখন জনগণের অধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার পরিবর্তে কোনো সরকার বা গোষ্ঠীর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহারের প্রশ্ন তৈরি করে।
পেশিশক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে সাময়িকভাবে দাবিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অন্যায়ের বোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে এই ক্ষোভ গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিদ্রোহের রূপ নিতে পারে। যখন সাধারণ মানুষ ভয়ভীতি উপেক্ষা করে অধিকার আদায়ের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে, তখন রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়েও সেই জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যে শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই শক্তির অপব্যবহারই শেষ পর্যন্ত পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
২. দলীয় কোন্দল ও দলের ভেতরে দল গঠন: একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি নির্ভর করে তার সাংগঠনিক ঐক্য, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এবং আদর্শিক অবস্থানের ওপর। কিন্তু দলের ভেতরে যখন ক্ষমতা, পদ-পদবি, প্রভাব ও মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করে, তখন সৃষ্টি হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
দলের শীর্ষ পদে কে আসবেন, কার প্রভাব বেশি থাকবে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার পক্ষে যাবে—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে আলাদা আলাদা বলয় বা গ্রুপ তৈরি হতে পারে। মূল দলের নীতির মধ্যে থেকেও কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু সেই ভিন্নমত যখন ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিংবা পদ-পদবি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, তখন দলের সাংগঠনিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
অনেক সময় কিছু নেতাকর্মী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আলাদা বলয় তৈরি করেন এবং দলের সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে নেওয়ার জন্য পর্দার আড়ালে সংগঠিতভাবে কাজ করেন। রাজনীতিতে এ ধরনের প্রবণতাকে অনেক সময় ‘দলের ভেতর দল’ বা ‘পকেট কমিটি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
দলের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য ও ভিন্নমত গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যখন ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সাংগঠনিক বিভক্তিতে পরিণত হয়, তখন মূল দল ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে। এতে দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়, নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের কাছেও দলের গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে।
৩. সাংবাদিকদের অতিরিক্ত আশ্রয়-প্রশ্রয় ও দলীয় প্রচার-প্রচারণা: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, সরকার ও রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করা। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা যখন সাংবাদিকদের অতিরিক্ত আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন এবং তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতার পরিবর্তে দলীয় প্রচার-প্রচারণায় ব্যবহার করেন, তখন সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
নেতা বা দলের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি কিংবা ব্যর্থতার খবর প্রকাশের পরিবর্তে কিছু সাংবাদিক যদি কেবল দলীয় সাফল্য ও নেতাদের ইতিবাচক প্রচারণায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে জনগণের কাছে প্রকৃত তথ্য পৌঁছানোর পথ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে রাজনৈতিক দল সাময়িকভাবে প্রচারণাগত সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ভুল ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার সুযোগ হারায়।
অন্যদিকে, নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিককে বিশেষভাবে কাছে টানার ফলে দলের অভ্যন্তরীণ তথ্য, গোপন সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁসের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে দলের ভেতরে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ ও কোন্দল আরও বাড়ে।
রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের কাছে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলটির ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ, তখন মানুষের মনে ধারণা তৈরি হতে পারে যে দলটি গণমাধ্যমকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
যেসব সাংবাদিক সততা, সাহস ও পেশাগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করতে চান, তাঁরা অনেক সময় দলঘেঁষা বা সুবিধাভোগী সাংবাদিকদের কারণে বৈষম্যের শিকার হন। এতে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। আবার সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দুর্বলতা জেনে তা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল কিংবা অন্যায় সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন। এ ধরনের ঝুঁকিও রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যম—উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের কাজ কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হওয়া নয়; বরং জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা। রাজনৈতিক নেতারা যখন গণমাধ্যমকে নিজেদের প্রচারণার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেন, তখন গঠনমূলক সমালোচনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা হারালে রাজনৈতিক দল নিজের ভুল সংশোধনের পথও হারিয়ে ফেলে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংবাদিকদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার—এই তিনটি প্রবণতা কোনো রাজনৈতিক দলের ভিত্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিতে পারে। জনগণের আস্থা হারানো, সাংগঠনিক ঐক্য নষ্ট হওয়া এবং সত্য প্রকাশের পথ সংকুচিত হওয়া—সব মিলিয়ে একটি দল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংকটের দিকে এগিয়ে যায়।
রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয় কিংবা প্রচারণার জোরে নয়; বরং জনগণের আস্থা, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্যেই নিহিত। যে দল এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একসময় অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।


