অপরাধীদের বসবাস রাজউকের ভিতরেই

সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউককে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠলেও এসব নির্মাণকাজ যথাযথভাবে তদারকি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজধানীর উত্তরার ফায়দাবাদ মৌজায় নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে এমনই এক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজউকের সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক ভবন নকশার বাইরে নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছে।

একটি সূত্রের দাবি, ফায়দাবাদ মৌজার ইমারত পরিদর্শক মেহেদী নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, রিট করার পর বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন যুক্তি দেখিয়ে ভবন মালিকদের আইনি পথে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এমনকি সংশ্লিষ্টদের জন্য আইনজীবীর সন্ধান করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে মেহেদীর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক মেহেদীর বক্তব্যও প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

গত ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পান্নান হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি তার প্রতিবেশী রওশন আলী রুষোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, পুরাকৈর মৌজার আরএস ৩৮ দাগে একটি আটতলা ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

পান্নান হাওলাদারের অভিযোগ, রওশন আলী রুষো ও আয়নাল হাজী তাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ করে আসছেন। এ ঘটনায় তিনি দক্ষিণখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন, যার নম্বর ৬৯, তারিখ ১ আগস্ট ২০২৬

অভিযোগ পাওয়ার পর ক্রাইম পেট্রোল বিডি-এর অনুসন্ধানী টিম বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং রাজউকের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে নানা অভিযোগের কথা জানা যায়।

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকরা নিয়মিতভাবে নির্মাণাধীন ভবনগুলো তদারকি করেন না। কেউ কেউ ইমারত পরিদর্শক শরফুদ্দিনের বিরুদ্ধেও ঘুষের বিনিময়ে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক শরফুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে ক্রাইম পেট্রোল বিডি। তিনি বলেন, “রাজউকের নকশা মেনে কেউই ভবন নির্মাণ করেন না।”

তার কাছে প্রশ্ন করা হয়, যদি অধিকাংশ ভবন নকশা মেনে নির্মাণ না হয়, তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক হিসেবে তার ভূমিকা কী?

জবাবে শরফুদ্দিন বলেন, তিনি মাঝেমধ্যে এলাকায় পরিদর্শনে যান। তবে তার দাবি, এলাকাবাসী তার কথা ঠিকমতো শুনছেন না।

নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিমালিকের অনিয়ম নয়; বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত নজরদারি থাকলে অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ কীভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে—এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

একই সঙ্গে ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের প্রবণতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।