পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট নানা বাধায় কমছে ইলিশের উৎপাদন। কমেছে বড় আকারের ইলিশের সংখ্যাও। প্রজনন ও ইলিশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে তাই শঙ্কিত গবেষকরা। তাদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী দিনে ইলিশ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্বাদ ও গন্ধের কারণে ইলিশের কদর বরাবরই আলাদা। এ কারণে রুপালি ইলিশকে মাছের রাজাও বলা হয়। একসময় উপকূলীয় নদনদী এবং পদ্মা-মেঘনায় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। জেলেদের জালে ধরা পড়ত ছোট-বড় নানা আকারের মাছ। তবে নির্বিচারে ইলিশ নিধনসহ নানা কারণে সেই চিত্র বদলে গেছে। গত কয়েক বছরে ইলিশের উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় দিনভর জাল ফেলেও আগের মতো ইলিশ পাচ্ছেন না জেলেরা। দক্ষিণাঞ্চলের নদনদীতেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছরজুড়েই ইলিশের পেটে ডিম পাওয়া যায়। তবে প্রজনন মৌসুমে এর পরিমাণ বেড়ে যায়। এবারও ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের ইলিশের পেটে ডিম পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ছোট আকারের ইলিশ বেশি পরিমাণ যেমন ধরা পড়ছে, তেমনি এগুলোর পেটে ডিমও মিলছে।
এদিকে, এবারের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ কী পরিমাণ ডিম ছেড়েছে, তা জানতে সাগরের মোহনা ও ছয়টি অভয়াশ্রমে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা চালিয়েছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা। তাদের পর্যবেক্ষণে আগের তুলনায় বড় আকারের ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। পাশাপাশি ছোট ইলিশের পেটে ডিম পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
ইলিশ গবেষক মেহেদী হাসান প্রামাণিক বলেন, চাঁদপুর থেকে দক্ষিণের সাগর মোহনা পর্যন্ত ১০টি পয়েন্ট থেকে ডিমওয়ালা এবং ডিম ছেড়েছে এমন ইলিশের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, ৩৬ থেকে ৪০ শতাংশ ইলিশ প্রজননে সক্ষম হয়েছে। তবে এ হার আরও বেশি হলে উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।
গবেষক দলের নেতা বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ বলেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ পেয়ে এবার দক্ষিণের সাগর ও মোহনায় নির্বিচারে ইলিশ শিকার করেছেন জেলেদের একাংশ। এর পাশাপাশি চর, ডুবোচর এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা ইলিশের উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে মৎস্যবিজ্ঞানীদের।
দেশের শীর্ষ ইলিশ বিশেষজ্ঞ ও মৎস্যবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আনিছুর রহমান বলেন, মা ইলিশ যে পরিমাণ ডিম ছেড়েছে, সেগুলো সুরক্ষিত রাখা গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ জন্য নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ৮ মাস কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাস জাটকা সংরক্ষণে অভয়াশ্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে নেয়া গেলে ইলিশের উৎপাদন আবারও বাড়ানো সম্ভব।
গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত টানা ২২ দিন মা ইলিশের প্রজনন সুরক্ষায় মাছ শিকার নিষিদ্ধ ছিল। এ সময়ে দুটি পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে দেশের ছয়টি অভয়াশ্রম ও সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।


