কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি বেদখল, নেপথ্যে কারা?

সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি সম্পত্তি বেদখলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডভুক্ত সরকারি খাসজমি—বিভিন্ন এলাকায় এসব সম্পত্তির ওপর গড়ে উঠেছে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, বস্তি ও নানা ধরনের স্থাপনা। কোথাও কোথাও সরকারি জমি দখল করে রাজনৈতিক কার্যালয় ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

তবে সারা দেশে সরকারি সম্পত্তির মোট কত একর বা হেক্টর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে—এ বিষয়ে একটি সমন্বিত ও হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যান বা কেন্দ্রীয় তালিকা জনসম্মুখে নেই। ফলে সরকারি সম্পত্তি দখলের প্রকৃত চিত্র ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও স্পষ্ট নয়।

পাউবোর জমি দখলের চিত্র: দেশের বিভিন্ন জেলা ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিপুল পরিমাণ জমি বিভিন্ন সময়ে অবৈধ দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নড়াইলে নদীর তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা ২ হাজার ৭৫০ একর জমির মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ একর জমি অবৈধ দখলে চলে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর একটি বড় অংশ ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মাদারীপুর ও টেকেরহাট এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ১০০ একর জমি দখল করে স্থায়ী স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকাতেও পাউবোর জমি দখলের বিভিন্ন ঘটনা সামনে এসেছে। মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রায় ১০০ একর জমি উদ্ধার কার্যক্রম এবং সাভারের তুরাগ তীরবর্তী এলাকায় ১০ একরের বেশি জমি দখলমুক্ত করতে নোটিশ দেওয়ার তথ্য বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।

বরগুনা, মাগুরা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ, খাল ও অধিগ্রহণকৃত জমিতে পাকা ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।

রেলওয়ের জমিও দখলমুক্ত নয় : শুধু পাউবো নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিপুল সম্পত্তিও অবৈধ দখলের বাইরে নয়।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির মোট ৩১ হাজার ৮৬০ একর জমির মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ২৪.৮৪ একর বিভিন্ন অবৈধ দখলদারের কবজায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

আঞ্চলিক হিসাবে পশ্চিমাঞ্চল—রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় এলাকায়—বেদখল জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রায় ২ হাজার ৭০৮.৬৫ একর জমি দখলে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় এলাকায়—বেদখল জমির পরিমাণ প্রায় ৩১৬.১৯ একর।

দখলকৃত এসব সরকারি জায়গায় কোথাও বাড়িঘর ও বস্তি, কোথাও দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির আর্থিক ঝুঁকি: সরকারি জমি দখলের ফলে শুধু জমির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে সংকট তৈরি হচ্ছে না; সরকার বিপুল রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর এলাকায় রেলওয়ের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি অবৈধ দখলে থাকার তথ্য বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া রেলওয়ের অনেক জমি বৈধভাবে লিজ বা ইজারা দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে ইজারা মূল্য ও রাজস্ব বকেয়া থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও বছরের পর বছর রাজস্ব পরিশোধ না করায় সরকারের বিপুল অর্থ আটকে থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।

খাসজমির হিসাবও অস্পষ্ট : সরকারি সম্পত্তির আরেকটি বড় অংশ হলো ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জমি। সাধারণভাবে জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডভুক্ত সরকারি জমিকে এ ধরনের সরকারি খাসজমির আওতায় চিহ্নিত করা হয়।

তবে সারা দেশে ১ নম্বর খাস খতিয়ানের মোট কত একর জমি বর্তমানে অবৈধ দখলে রয়েছে—এমন কোনো নির্দিষ্ট ও সমন্বিত পরিসংখ্যান সহজলভ্য নয়।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সরকারি খাস খতিয়ানের জমি জরিপ, মাঠপর্যায়ের পর্চা ও রেকর্ড যাচাইয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবে কত জমি দখলমুক্ত, কত জমি দখলে এবং কত জমি নিয়ে মামলা বা বিরোধ রয়েছে—তার একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চিত্র প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নেপথ্যে কারা? সরকারি সম্পত্তি দখলের ঘটনায় প্রায়ই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নাম অভিযোগ হিসেবে সামনে আসে। কোথাও দখলদাররা নিজেরাই স্থাপনা তৈরি করে, আবার কোথাও জমি দখলের পর তা অন্যের কাছে বিক্রি, ভাড়া বা লিজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তবে শুধু দখলদারদের চিহ্নিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারি জমির রেকর্ড, সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কোনো পর্যায়ে প্রশাসনিক গাফিলতি বা যোগসাজশ ছিল কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উদ্ধার অভিযান কতটা কার্যকর? সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোও বিভিন্ন এলাকায় দখলমুক্ত কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে উচ্ছেদ অভিযানের পরও কিছুদিনের মধ্যে আবারও সরকারি জমি দখল হয়ে যায়। ফলে উচ্ছেদের পাশাপাশি উদ্ধার করা জমিতে স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ, সাইনবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত নজরদারি এবং পুনরায় দখল হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সরকারি সম্পত্তি জনগণের সম্পদ। এসব জমি দখল হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষ। তাই দেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অধীন জমির একটি কেন্দ্রীয়, হালনাগাদ ও প্রকাশ্য ডাটাবেজ তৈরি করে কোন জমি কোথায়, কত পরিমাণ এবং কী অবস্থায় রয়েছে—তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি।

কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি কারা দখল করছে, কীভাবে দখল হচ্ছে এবং এর নেপথ্যে কোনো প্রভাবশালী মহল বা সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

—অনুসন্ধান চলমান