স্বয়ংক্রিয় দরজা, সুগন্ধময় কামরা, আধুনিক টয়লেট, শিশুকে রাখার আলাদা আসন। ঘণ্টায় ২৮৫ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলা জাপানের বুলেট ট্রেনে চড়ে মুগ্ধ ভারতীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হর্ষিতা গুপ্তা। তবে এত আয়োজনের মধ্যেও মন খারাপ তার একটাই কারণে, নেই চিরচেনা ‘চা-চা’ হাঁক কিংবা খাবার বিক্রেতাদের আনাগোনা।
ট্রেনে চড়লেই দরজা খুলতে হবে না, নাকে আসবে সুগন্ধ, ঝকঝকে কামরায় থাকবে আধুনিক সব সুবিধা। এমনকি টয়লেটে যাওয়ার সময় শিশুকে নিরাপদে রাখার জন্যও রয়েছে আলাদা আসন। জাপানের বুলেট ট্রেনের এমন সব আয়োজন দেখে মুগ্ধ হয়েছেন ভারতীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হর্ষিতা গুপ্তা। তবে এত আধুনিকতার মধ্যেও তার মনে হয়েছে, কোথায় যেন কী একটা নেই!
সম্প্রতি জাপানের বুলেট ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন হর্ষিতা। সেখানে ট্রেনের নানা সুবিধা তুলে ধরার পাশাপাশি ভারতীয় রেলযাত্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। তার ভিডিওতে যেমন উঠে এসেছে জাপানের প্রযুক্তিনির্ভর রেলসেবার চিত্র, তেমনি ফুটে উঠেছে ভারতীয় ট্রেনযাত্রার পরিচিত কিছু অভ্যাসের প্রতি তার টান।
দরজায় হাত দিতে হয় না
ভিডিওর শুরুতেই ট্রেনের চেয়ারকারের দরজা দেখান হর্ষিতা। দরজার কাছে গিয়ে তিনি বলেন, সেখানে কারও হাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যাত্রীর উপস্থিতি শনাক্ত করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায় দরজা। বিষয়টি দেখিয়ে তিনি মজা করে বলেন, ‘দেখুন, এই চেয়ারকারের দরজা শুধু আপনার উপস্থিতি বুঝেই খুলে যায়। স্পর্শ করার দরকার নেই, একেবারেই না।’
এরপর দরজার কাছের আসনগুলোর পাশের পরিবেশ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা জানান তিনি। ভারতীয় ট্রেনে দরজার কাছে অনেক সময় দুর্গন্ধ পাওয়া যায় বলে ইঙ্গিত করে হর্ষিতা বলেন, সেখানে প্রথমবারের মতো দুর্গন্ধের বদলে সুগন্ধ পেয়েছেন তিনি।
মন খারাপ চা-চা হাঁক না শুনে
জাপানের ট্রেনে আধুনিকতার কোনো ঘাটতি না থাকলেও হর্ষিতার কানে বাজছিল অন্য কিছু। ভারতীয় ট্রেনে ভ্রমণের সময় চা বিক্রেতাদের ‘চা-চা’ হাঁক তার কাছে পরিচিত দৃশ্য ও শব্দ। কিন্তু জাপানের বুলেট ট্রেনে সেই পরিচিত ডাক নেই।
এ নিয়ে মজার ছলে হর্ষিতা বলেন, ‘আমার কান “চা-চা” শুনতে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু কেউ এল না, বন্ধুরা। আমার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।’
তার এই মন্তব্যেই যেন ধরা পড়ে ভ্রমণের এক অন্য রকম অনুভূতি। প্রযুক্তি ও আরাম যতই থাকুক, পরিচিত পরিবেশের ছোট ছোট অভ্যাসও মানুষের কাছে বিশেষ হয়ে উঠতে পারে।
ট্রেনে আধুনিক টয়লেট
ভিডিওর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশে হর্ষিতা দর্শকদের নিয়ে যান ট্রেনের টয়লেটে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৮৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম ট্রেনটির টয়লেট ব্যবস্থাপনা দেখিয়ে তিনি বলেন, চলুন দেখা যাক, এমন গতির ট্রেনে শৌচাগারের ব্যবস্থা কেমন।
ভেতরে ঢুকে তিনি দেখান, শিশুকে সঙ্গে নিয়ে কোনো অভিভাবক টয়লেট ব্যবহার করতে চাইলে ছোট একটি আসনে শিশুকে বসিয়ে রাখতে পারেন। এরপর দেখান পানি দিয়ে পরিষ্কারের ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। পানির প্রবাহের চাপ নিয়ে মজা করে তিনি বলেন, এখানে অন্ত্রের চাপের কথা নয়, পানির প্রবাহের চাপের কথা বলা হচ্ছে।
এরপর ফ্লাশের ব্যবস্থা দেখিয়ে হাস্যরসের ভঙ্গিতে বলেন, বোতাম চাপলেই মল অদৃশ্য হয়ে যায়। আধুনিক টয়লেটের এমন ব্যবস্থা তার কাছে বেশ চমকপ্রদ মনে হয়েছে।
নির্জন স্টেশনেও নেই খাবার বিক্রেতা
ট্রেনের পাশাপাশি স্টেশনের পরিবেশও দেখিয়েছেন হর্ষিতা। তার চোখে স্টেশনটি ছিল বেশ শান্ত ও নিরিবিলি। কিন্তু ভারতীয় স্টেশনের মতো সেখানে খাবার বিক্রেতাদের আনাগোনা দেখতে পাননি তিনি।
এ নিয়ে তার রসিক মন্তব্য, স্টেশনটি বেশ নীরব ও নির্জন। কেউ সমুচা বিক্রি করতে আসছে না, নেই পাকোড়া বিক্রেতাও। এখানে শুধু আপনি আর আপনার অ্যামেলিয়া।
ভিডিওর শেষে আরও একটি রসিকতা করেন হর্ষিতা। বলেন, ‘উঁচুতে থাকলে সব সময়ই একাকিত্ব।’
প্রযুক্তির সঙ্গে স্মৃতির টান
হর্ষিতার ভিডিওতে জাপানের বুলেট ট্রেনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি উঠে এসেছে ভ্রমণের সাংস্কৃতিক পার্থক্যও। একদিকে স্বয়ংক্রিয় দরজা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও আধুনিক টয়লেট; অন্যদিকে চা বিক্রেতার হাঁক কিংবা স্টেশনে সমুচা-পাকোড়ার পরিচিত উপস্থিতি।
তার মজার উপস্থাপনায় বোঝা যায়, ভ্রমণ শুধু দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিচিত শব্দ, খাবার ও পরিবেশের স্মৃতিও। আর সে কারণেই জাপানের বুলেট ট্রেনে এত আয়োজন দেখেও হর্ষিতার মন খারাপ হয়েছে সেই চিরচেনা ‘চা-চা’ হাঁক না শুনে!


