সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক পেশা। সমাজের অসংগতি তুলে ধরা, জনস্বার্থ রক্ষা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার জগতে ‘মূলধারার সাংবাদিক’, ‘হলুদ সাংবাদিক’ ও ‘ভুঁইফোড় সাংবাদিক’—এমন কয়েকটি শব্দ প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। এসব শব্দের অর্থ, বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
১. মূলধারার সাংবাদিক কাকে বলে?
মূলধারার সাংবাদিক বলতে সাধারণত এমন পেশাদার সাংবাদিককে বোঝায়, যিনি প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই, সম্পাদনা ও প্রকাশের কাজে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও এবং প্রতিষ্ঠিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত স্টাফ রিপোর্টার, সংবাদদাতা, বিশেষ প্রতিনিধি ও অন্যান্য সংবাদকর্মীরা এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
মূলধারার সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য:
১. প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের হয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন।
২. সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সম্পাদনা ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।
৩. সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক, সাব-এডিটর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ সংবাদ সম্পাদনা ও যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করে।
৪. সংবাদ পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
৫. জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম, সামাজিক সমস্যা, দুর্নীতি, অপরাধ ও মানবাধিকার নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
৬. প্রকাশিত সংবাদের দায় ও জবাবদিহি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপরও বর্তায়।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু বড় বা প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে কাজ করলেই একজন সাংবাদিকের সব প্রতিবেদন নির্ভুল হয়ে যায় না। মূলধারার গণমাধ্যমেও ভুল, পক্ষপাত বা অনৈতিক সাংবাদিকতা হতে পারে।
২. হলুদ সাংবাদিকতা কাকে বলে?
হলুদ সাংবাদিকতা বলতে এমন সংবাদ পরিবেশনকে বোঝায়, যেখানে পাঠক বা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রচার, বিক্রি বা জনপ্রিয়তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অতিরঞ্জন, চাঞ্চল্য সৃষ্টি, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম কিংবা অপ্রমাণিত তথ্য ব্যবহার করা হয়।
হলুদ সাংবাদিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য:
১. খবরের প্রকৃত বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল না রেখে চটকদার, বিভ্রান্তিকর বা অতিরঞ্জিত শিরোনাম ব্যবহার করা।
২. সাধারণ ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে ভয়াবহ, রহস্যময় বা চাঞ্চল্যকর হিসেবে উপস্থাপন করা।
৩. যথাযথ তথ্য যাচাই ও প্রমাণ ছাড়াই মনগড়া বা অপ্রমাণিত তথ্য প্রকাশ করা।
৪. সমাজের ইতিবাচক ও গঠনমূলক খবরের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি, গুজব ও চাঞ্চল্যকর অপরাধের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া।
৫. কাল্পনিক সাক্ষাৎকার, অসমর্থিত বক্তব্য কিংবা যাচাইহীন বেনামি সূত্রের ওপর নির্ভর করে সংবাদ প্রকাশ করা।
৬. পাঠক বা দর্শকের আবেগকে কাজে লাগিয়ে ক্লিক, ভিউ ও জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করা।
হলুদ সাংবাদিকতার উৎপত্তি:
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে, বিশেষ করে ১৮৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে জোসেফ পুলিৎজারের ‘নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড’ এবং উইলিয়াম র্যান্ডলফ হার্স্টের ‘নিউইয়র্ক জার্নাল’-এর মধ্যে পাঠক আকর্ষণের তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ওই সময় দুটি পত্রিকাতেই ‘দ্য ইয়েলো কিড’ (The Yellow Kid) নামের জনপ্রিয় কার্টুন প্রকাশিত হতো। এই কার্টুনকে ঘিরে সংবাদপত্রের প্রতিযোগিতা থেকে ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ বা ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ শব্দটির প্রচলন ঘটে।
বর্তমানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লিকবেইট শিরোনাম, অতিরঞ্জিত সংবাদ এবং যাচাইহীন তথ্য প্রচারের মধ্যেও হলুদ সাংবাদিকতার প্রবণতা দেখা যায়।
৩. ভুঁইফোড় সাংবাদিক কাকে বলে?
‘ভুঁইফোড় সাংবাদিক’ কোনো স্বীকৃত পেশাগত বা আইনি শ্রেণিবিভাগ নয়; এটি সাধারণত সমালোচনামূলক অর্থে ব্যবহৃত একটি প্রচলিত শব্দ। সাধারণভাবে এমন ব্যক্তিকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়, যিনি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করলেও তাঁর পরিচিত গণমাধ্যম, প্রকাশনা, দায়িত্ব বা পেশাগত কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি অনিবন্ধিত বা অস্তিত্বহীন সংবাদমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে সাংবাদিক পরিচয় দেন। আবার কেউ কেউ সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্ল্যাকমেইল কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
ভুঁইফোড় সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতিবাচক প্রবণতা:
১. অস্তিত্বহীন, অস্বচ্ছ বা সাইনবোর্ডসর্বস্ব গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া।
২. ভুয়া পরিচয়পত্র, পদবি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করা।
৩. সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ কিংবা অন্যায় সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা।
৪. পেশাগত দায়িত্বের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রভাব বিস্তার বা ব্ল্যাকমেইলকে প্রাধান্য দেওয়া।
৫. তথ্য যাচাই না করে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করা।
৬. সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে পদ-পদবি, সদস্যপদ কিংবা পরিচয়পত্রের বাণিজ্য করা।
তবে কোনো সাংবাদিক ছোট অনলাইন পোর্টাল, নতুন সংবাদমাধ্যম কিংবা স্বাধীনভাবে কাজ করেন বলেই তাঁকে ভুঁইফোড় বলা যায় না। তাঁর কাজ, পরিচয়ের সত্যতা, পেশাগত আচরণ ও নৈতিকতা যাচাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
৪. তিন ধরনের সাংবাদিকতার মধ্যে পার্থক্য
| বিষয় | মূলধারার সাংবাদিকতা | হলুদ সাংবাদিকতা | ভুঁইফোড় সাংবাদিকতা |
| মূল পরিচয় | প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত সাংবাদিকতা | অতিরঞ্জিত ও চাঞ্চল্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশন | অস্পষ্ট বা ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার |
| প্রধান লক্ষ্য | সত্য ও জনস্বার্থ তুলে ধরা | পাঠক-দর্শক আকর্ষণ | অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় |
| তথ্য যাচাই | যাচাই ও সম্পাদনার প্রক্রিয়া থাকে | যাচাইহীন বা বিকৃত তথ্যের ঝুঁকি বেশি | তথ্য যাচাইয়ের পেশাগত চর্চা অনুপস্থিত থাকতে পারে |
| নৈতিকতা | পেশাগত নীতিমালা অনুসরণের প্রত্যাশা | নৈতিকতার ব্যত্যয় ঘটে | পরিচয় ও পেশাগত আচরণে অসততার অভিযোগ থাকতে পারে |
| প্রভাব | জনমত গঠন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা | বিভ্রান্তি ও ভুল জনমত তৈরি | সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত |
৫. প্রকৃত সাংবাদিক চেনার উপায়
প্রকৃত সাংবাদিক চেনার ক্ষেত্রে শুধু পরিচয়পত্র, প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা পদবি দেখাই যথেষ্ট নয়। বরং কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন—
- তিনি কোন গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠানটির বাস্তব অস্তিত্ব আছে কি না।
- তাঁর পরিচয়পত্র ও দায়িত্বের সত্যতা যাচাই করা যায় কি না।
- তিনি সংবাদ সংগ্রহের সময় তথ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেন কি না।
- সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করেন কি না।
- ভুল হলে সংশোধন ও জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকেন কি না।
- সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা বা অর্থ দাবি করেন কি না।
সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার নয়; এটি জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব। মূলধারার সাংবাদিকতার পরিচয় বড় প্রতিষ্ঠান দিয়ে নয়, বরং পেশাগত সততা, দায়িত্বশীলতা ও জনস্বার্থে কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, হলুদ সাংবাদিকতা সত্যকে বিকৃত করে এবং ভুঁইফোড় পরিচয়ের অপব্যবহার সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর প্রেস কার্ড বা পদবি নয়—তাঁর সততা, সাহস, তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দক্ষতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় প্রকৃত সাংবাদিকদের যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি ভুয়া পরিচয় ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।


