২৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও আরও ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার চাপ

সৌদি প্রবাসীকে অপহরণের অভিযোগ

ক্রাইম রিপোর্টার, আনিছুরজ্জামান খোকন: সৌদি আরবে কর্মরত এক বাংলাদেশি প্রবাসীকে অপহরণ করে ২৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি এবং পরিবারের কাছ থেকে দফায় দফায় প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, বিপুল অঙ্কের টাকা দেওয়ার পরও ওই প্রবাসীকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং আরও ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে প্রবাসী ও দেশে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, অপহরণ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

অভিযোগকারী প্রবাসীর ছেলে মো. নাঈম হোসেন জানান, তার বাবা বাবুল দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত। গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরবের স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ১২টা এবং বাংলাদেশ সময় রাত আনুমানিক ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের বাথা মার্কেটে কর্মরত অবস্থায় মিজান হাওলাদার, পিতা—বারেক হাওলাদার; ফেরদৌস, পিতা—হালিম প্যাদা এবং ইমরান, পিতা—হালিম প্যাদা নামের ব্যক্তিরা তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

নাঈমের দাবি, অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার পর তার বাবাকে মারধর করা হয়। এ সময় তার অশ্লীল ভিডিও ধারণ, ইকামা ও হাতের টিপসহি নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পরদিন ৩১ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে একটি ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে তারা ঘটনার বিষয়টি জানতে পারেন। তখন ২৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিলে বাবুলকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

দফায় দফায় টাকা প্রদান, তবুও শেষ হয়নি দাবি

প্রবাসীকে উদ্ধারের আশায় পরিবারের পক্ষ থেকে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কয়েক দফায় টাকা পাঠানো হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, সাইনবোর্ড শাখার একটি হিসাবে ৩ লাখ ৪০০ টাকা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির দুটি হিসাবে যথাক্রমে ৬ লাখ টাকা ও ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এভাবে মোট ৯ লাখ ৫০ হাজার ৪০০ টাকা পাঠানো হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।

এছাড়া পরিবারের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে ১২ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৪ লাখ টাকা, নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন নাঈম। সব মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তার দাবি।

কিন্তু এত টাকা দেওয়ার পরও কথিতভাবে মুক্তিপণের দাবি থামেনি। বরং সৌদি আরবের একটি মোবাইল নম্বর এবং কয়েকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিবারের কাছে আরও ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন নাঈম।

টাকা না দিলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি

নাঈমের অভিযোগ, দাবিকৃত টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের অপহরণ, মারধর এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে সৌদি আরবে বাবুলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন তারা।

এদিকে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে। নাঈম দাবি করেন, ইমরানের ভাই আরাফাত, পিতা—হালিম প্যাদা, কেওয়া বুনিয়া, আমতলী, বরগুনা এলাকায় লোকজন নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের ওপর হামলার চেষ্টা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি

পরিবারের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানাসহ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সহযোগিতা চাওয়া হলেও তারা প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। মিজানের ভাই পুলিশে কর্মরত থাকায় আমতলী থানায় অভিযোগ গ্রহণে অনীহা দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করেন নাঈম।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নাঈম বলেন, “আমার বাবা কোথায় আছেন, তিনি জীবিত ও নিরাপদ আছেন কি না—এ নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে আছি। ইতোমধ্যে বিপুল টাকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও নতুন করে টাকা দাবি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা দ্রুত আমার বাবাকে উদ্ধার এবং আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা চাই।”

পরিবারের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাবুলকে দ্রুত উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, অভিযোগের তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, অভিযোগে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা জবাব/পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।