স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো চুক্তি নয়: আরাগচি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হবে না ইরান। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের স্থায়ী অবসানই তেহরানের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ইরানি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। তার এ বক্তব্য এমন সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তী সমঝোতার আওতায় নির্ধারিত ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা কোনো স্থায়ী সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।

আরাগচি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা এমন কোনো যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না, যা শুধু কিছু সময়ের জন্য যুদ্ধ থামিয়ে রাখবে। বরং তেহরান যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান চায়।

তিনি বলেন, ‘আমরা মধ্যস্থতাকারীদের বলেছি, আমরা যুদ্ধবিরতি মেনে নেব না; বরং যুদ্ধের সমাপ্তি চাই।’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেন। তার মতে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা যৌথ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

মধ্যস্থতার জন্য কাতার ও পাকিস্তানেরও প্র আরাগচিশংসা করেন আরাগচি। তিনি বলেন, দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং বর্তমানে তেহরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো পর্যায়ে রয়েছে।

‘যুদ্ধ ও কূটনীতি—দুটিতেই ইরানের জয়’

ইরানি শিক্ষাবিদদের এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে আরাগচি দাবি করেন, যুদ্ধ ও কূটনীতি—দুই ক্ষেত্রেই ইরান জয়ী হয়েছে। তিনি বলেন, যারা শুরুতে ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছিল, যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর তারাই তেহরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য অনুরোধ করতে বাধ্য হয়েছে।

আরাগচির দাবি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তিগুলোর একটি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন নিয়েও প্রতিপক্ষ কয়েকদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা শক্তি দিয়ে লড়েছি এবং শক্তি দিয়েই আলোচনা করেছি।’

ট্রাম্পের ‘সাদা পতাকা’ দেখানোর আহ্বান

আরাগচির বক্তব্যের আগে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইরান একটি চুক্তি করতে চায়, তবে ওয়াশিংটন যে ধরনের চুক্তি প্রয়োজন মনে করে, তেহরান তা করতে রাজি নয়।

ট্রাম্প ইরানকে ‘সাদা পতাকা’ তুলে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানান।

তবে ইরান স্পষ্ট করেছে, তারা আর কোনো অস্থায়ী সমঝোতায় যাবে না। তেহরানের দাবি, যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি: আরাগচি

কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার কথা স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হিসেবে দেখতে নিষেধ করেছেন আরাগচি।

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকে সই করে। এর লক্ষ্য ছিল চলমান সংঘাতের অবসান এবং একটি বৃহত্তর চুক্তির পথ তৈরি করা। ওই সমঝোতার আওতায় নির্ধারিত ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা সোমবার কোনো স্থায়ী সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।

ট্রাম্পও এর আগে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না বা আলোচনার কোনো সময়সূচিও নির্ধারিত হয়নি। দুই দেশই অন্তর্বর্তী সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি নাকচ করেছে।

আরও চাপ দিলে ছাড় দেবে না ইরান

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, জুনের সমঝোতায় যা ছিল, তার চেয়েও বেশি ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে কালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে ইরানের ওপর চাপ বাড়ালে তেহরান আরও বেশি ছাড় দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু তাদের চাওয়া বিষয়গুলো জুনের সমঝোতায় ছিল না।

তিনি মার্কিন অর্থমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভূমিকাও সমালোচনা করেন।

সামরিক অবস্থান আরও কঠোর করার ইঙ্গিত

স্থায়ী সমঝোতার আলোচনা থমকে যাওয়ার মধ্যে ইরান সামরিক অবস্থানও আরও কঠোর করার দিকে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তেহরান ‘সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট’ হামলার মাধ্যমে মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করতে পারে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছে ইরান।

কূটনীতি বাধাগ্রস্ত করছে ইসরাইল: আরাগচি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার জন্য ইসরাইলকেও দায়ী করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইসরাইলকে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন।

আরাগচির অভিযোগ, ইসরাইল শুরু থেকেই সমঝোতা ঠেকানো, তা ব্যর্থ করে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন না হতে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং নিজেদের শর্তে আলোচনায় প্রবেশ করেছে।

আরাগচি আরও বলেন, ‘দুর্বল ইরানের ধারণা এখন অতীত।’ তার দাবি, দীর্ঘ সংঘাত ইরানকে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় করেছে।

এদিকে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা শেষ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। একদিকে তেহরান স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন তাদের বৃহত্তর দাবিগুলো পূরণ না হলে কোনো নতুন সমঝোতায় যেতে নারাজ। ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থার পাশাপাশি নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।