অনুসন্ধানে: সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি

অপরাধ, অনিয়ম ও দুর্নীতির শীর্ষে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (Department of Livestock Services) দেশের গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির উন্নয়ন, প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খামারিদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধ, বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা, কৃত্রিম প্রজনন, খামারিদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং সরকারি সহায়তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে এগিয়ে নেওয়াই এই অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্য।

অধিদপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ক্ষুরারোগ, অ্যানথ্রাক্স, বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা, বিনামূল্যে ভেটেরিনারি চিকিৎসা সেবা প্রদান, উন্নত জাতের গবাদিপশু উৎপাদনে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম পরিচালনা, খামারিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান, সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তিতে সহায়তা, দুধ, মাংস ও ডিমের মান নিয়ন্ত্রণ, পশুখাদ্যের গুণগত মান তদারকি এবং গবেষণাগারে প্রাণীর বিভিন্ন রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা। এসব সেবা জেলা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও সরকারি ভেটেরিনারি হাসপাতালের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।

কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, জেলা থেকে উপজেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বিভিন্ন সরকারি ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে ক্রয়-বাণিজ্যে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নামমাত্র মূল্যের যন্ত্রপাতি ও সামগ্রী অতিরিক্ত দামে ক্রয়, নিম্নমানের কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরবরাহ এবং নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সংগ্রহের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান বা ভুয়া সরবরাহকারীর নামে বিল প্রদর্শনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। দরপত্রের শর্তে কারসাজি, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং এর বিনিময়ে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রকৃত খামারিদের পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্মীয়-স্বজন বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে ভুয়া খামার দেখিয়ে সরকারি প্রণোদনা, ঋণ ও গবাদিপশু বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

মাঠপর্যায়ের জরুরি সেবার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি যানবাহন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি, কৃত্রিম প্রজনন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার না করে দায়সারা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি ও অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং একাধিক ঘটনায় তদন্ত ও মামলা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগের কার্যকর ও দৃশ্যমান প্রতিকার হয়নি।

সাধারণ জনগণের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা, সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে অসহযোগিতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক খামারি প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করেন তারা।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়মিত নজরদারি এবং সাধারণ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।

পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে—
অভিযোগে উঠে আসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকল্প, অনিয়মের ধরন, অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য (যদি পাওয়া যায়)।

সম্পাদকের নোট: এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিষয়গুলো বিভিন্ন অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য এবং পূর্বে প্রকাশিত অনুসন্ধান ও তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশের আগে তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ যাচাই করা সাংবাদিকতার নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।