রাজধানীসহ সারাদেশে ফুটপাত-হাটবাজারে চাঁদাবাজি: থামাবে কে?

সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি: রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার ফুটপাত, হাট-বাজার, খেয়াঘাট ও লঞ্চঘাটে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোথাও ফুটপাতের দোকানদার, কোথাও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আবার কোথাও হাটে পণ্য নিয়ে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এসব অভিযোগের কথা জানা গেছে। তাদের দাবি, অনেক জায়গায় নির্দিষ্ট কোনো সরকারি রসিদ ছাড়াই বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। মফস্বল এলাকার সাপ্তাহিক হাটগুলোতেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো হাট সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত, আবার কোনো কোনো হাট বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে। এসব হাটে পণ্য বিক্রির ওপর বিভিন্ন নামে টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, অল্প পরিমাণ পণ্য বিক্রি করেও খাজনা বা চাঁদা দিতে হয়। ফলে লাভের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে আদায়কারীদের হাতে।

শুধু হাট-বাজার নয়, খেয়াঘাট, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ স্থানেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এমনকি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠছে।

প্রশ্ন উঠছে—এই চাঁদাবাজি বন্ধ করবে কে? সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এসব অনিয়ম ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি থাকলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় কেন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অতীতের অভিযোগ থেকে বর্তমান বাস্তবতা দেশে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধের দাবি উঠেছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কিছু এলাকায় পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুনভাবে বিভিন্ন ধরনের অর্থ আদায়ের অভিযোগ দেখা যাচ্ছে।

তবে কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং সরকারি নথিপত্র যাচাই করাও জরুরি।

তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়ে সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি সংক্রান্ত তথ্য জানতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ৮ ধারার আওতায় আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বার্তা বিভাগ।

আইনের ৮ ধারায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত, ইলেকট্রনিক বা ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই আইনের ৯ ধারায় সাধারণভাবে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে; একাধিক ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে।

ক্রাইম পেট্রোল বিডির বার্তা বিভাগের দাবি, আবেদন, ট্রেজারি চালান ও পোস্টাল অর্ডারের মাধ্যমে তথ্য চাওয়ার পরও কয়েকটি বিষয়ে প্রত্যাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যে রিভার প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম-এর কাছে তথ্য চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে আতিকুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব অভিযোগকে একটি স্বার্থান্বেষী ও চক্রের অপপ্রচার হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীকে অবহিত করে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক বরাবর অভিযোগ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে ক্রাইম পেট্রোল বিডি।

সাসেক প্রকল্প নিয়েও তথ্য চাওয়া হয়েছে অন্যদিকে সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ কে মোহাম্মদ ফজলুল করিমের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ক্রাইম পেট্রোল বিডির বার্তা বিভাগ।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীকে অবহিত করে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

তথ্য না পেলে আইনি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়া, তথ্যের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা বা অসম্পূর্ণ/ভুল তথ্য দেওয়ার মতো ঘটনায় তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। আইনের ১৩ ধারায় এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে।

ফলে কোনো সরকারি দপ্তর তথ্য না দিলে বিষয়টি শুধু সংবাদ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে তথ্য কমিশনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রতিকার চাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

ফুটপাত থেকে প্রকল্প—জবাবদিহিতা কোথায়? ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হাটের দোকানি, খেয়াঘাটের ব্যবসায়ী কিংবা বড় সরকারি প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই অর্থ আদায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারা টাকা আদায় করছে, কার অনুমতিতে আদায় করছে, আদায়ের টাকা কোথায় যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কোনো সরকারি বা বেসরকারি ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নথি যাচাই, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।

ক্রাইম পেট্রোল বিডির বার্তা বিভাগ বলছে, জনস্বার্থে এসব বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ করে পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

অনুসন্ধান চলমান…