সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি: দেশের নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটির পণ্য বিতরণ ও ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এসব অনিয়ম বন্ধে টিসিবির কার্যকর পদক্ষেপ কতটুকু?
টিসিবির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে তেল, ডাল, চিনি ও ছোলাসহ বিভিন্ন পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা হয়।
এছাড়া খোলা বাজারে কিংবা ট্রাকসেলের মাধ্যমে কম দামে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থাও রয়েছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে অতিরিক্ত দাম বাড়াতে না পারে, সে ক্ষেত্রেও টিসিবির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।
রমজানসহ বিশেষ সময় কিংবা বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি ও মজুতের মাধ্যমেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে সরকারের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও বাজার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে টিসিবি।
টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড ও পণ্য বিতরণ কার্যক্রমে অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি, ভুয়া বা ত্রুটিপূর্ণ কার্ড, পণ্য বিতরণে অনিয়ম এবং কালোবাজারে পণ্য বিক্রির মতো অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ের পর বিপুলসংখ্যক ভুয়া ও ত্রুটিপূর্ণ ফ্যামিলি কার্ড শনাক্ত হয়েছে এবং অনিয়মের কারণে ৩৭ থেকে ৪৩ লাখ কার্ড বাতিল করার তথ্যও সামনে এসেছে।
প্রশ্ন হলো—যেসব কার্ড যাচাইয়ের পর বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো কীভাবে শুরুতে অনুমোদন পেল? কারা এসব কার্ড তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল? আর প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষ বাদ পড়ে অযোগ্য ব্যক্তিরা কীভাবে সুবিধা পেলেন?
টিসিবির পণ্য বিতরণে ডিলার ও পরিবেশকদের বিরুদ্ধে ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ৬০ থেকে ১৬০ গ্রাম পর্যন্ত কম পণ্য দেওয়া হয়েছে।
একজন সুবিধাভোগীর জন্য সামান্য পরিমাণ কম মনে হলেও লাখ লাখ পরিবারের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে। তাই পণ্য বিতরণের সময় ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা, তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কার্ডধারীদের জন্য বরাদ্দকৃত ন্যায্যমূল্যের পণ্য তাদের না দিয়ে খোলা বাজার কিংবা কালোবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেই নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে এসব পণ্য সরবরাহ করছে।
টিসিবির পণ্য নির্ধারিত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, ডিলাররা কত পণ্য গ্রহণ করছেন এবং কত পণ্য বিতরণ করছেন—এসব তথ্যের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডিলারশিপ প্রদান ও চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রেও স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেক সুবিধাভোগী।
প্রশ্ন উঠছে—ডিলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড কতটা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে? অভিযোগ পাওয়া গেলে কতজন ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আর যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, তাদের ডিলারশিপ কি বাতিল করা হয়েছে?
টিসিবির অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারি ও তদন্তের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এখন প্রয়োজন শুধু অভিযোগের তদন্ত নয়; অভিযোগের উৎস, ডিলার নির্বাচন, পণ্য বরাদ্দ, পরিবহন, গুদাম থেকে বিতরণ এবং সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
টিসিবির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে—
- ফ্যামিলি কার্ড নিয়মিত যাচাই ও হালনাগাদ করা;
- ভুয়া কার্ড তৈরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া;
- পণ্য বিতরণে ডিজিটাল ওজন ও ডিজিটাল রেকর্ড নিশ্চিত করা;
- ডিলারদের কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করা;
- অতিরিক্ত দাম ও ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া;
- কালোবাজারে পণ্য বিক্রির অভিযোগে কঠোর নজরদারি করা;
- ডিলার নিয়োগ ও চুক্তি নবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা;
- সুবিধাভোগীদের সরাসরি অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখা এবং
- অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কারণ টিসিবির পণ্য কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়—এগুলো মূলত নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের ভর্তুকি দেওয়া সুবিধা। সেই সুবিধা যদি মধ্যস্বত্বভোগী, অসাধু ডিলার কিংবা প্রভাবশালীদের হাতে চলে যায়, তাহলে সরকারের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—টিসিবির অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে দেখার যেন কেউ নেই? নাকি নজরদারি থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না?


