নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, ফায়দাবাদ ও গোয়ালটেক এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ ও তথাকথিত “শেয়ারিং কনসেপ্ট” ঘিরে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধানে এবার সামনে এসেছে নতুন কিছু তথ্য। বিভিন্ন নথি, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একাধিক প্রকল্পে প্রচলিত ফ্ল্যাট নিবন্ধনের পরিবর্তে “শেয়ারিং চুক্তি”র মাধ্যমে ইউনিট হস্তান্তরের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের লেনদেনে ক্রেতাদের মালিকানা, কর পরিশোধ এবং আইনি সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পে ক্রেতাদের সঙ্গে বিক্রয় দলিলের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেকেই পূর্ণ অর্থ পরিশোধের পরও পৃথক রেজিস্টার্ড দলিল পাননি। ফলে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি হস্তান্তর কিংবা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে তারা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
আইনজীবীদের মতে, কোনো সম্পত্তির মালিকানা নিশ্চিত করতে নিবন্ধিত দলিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল একটি বেসরকারি চুক্তিপত্র ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে চুক্তিগুলোর আইনি বৈধতা সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা সাপেক্ষে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, রিয়াজ মোল্লা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। কখনও তিনি সাপোর্ট টু কনভিয়েন্ট লিমিটেড–এর পরিচালক, আবার কখনও স্পেস টেন–এর কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পভেদে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তিত হলেও পরিচালনায় একই ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা দেখা যায়। ফলে প্রকল্পে কোনো জটিলতা দেখা দিলে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজউকের পক্ষ থেকে নকশা ব্যত্যয়ের অভিযোগে নোটিশ জারির পরও সংশ্লিষ্ট ভবনে কার্যক্রম চলমান থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ রয়েছে, ভবনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও ইউনিট হস্তান্তরও অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, যদি সত্যিই ভবনটি অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও জোরদার হওয়া উচিত ছিল।
সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগের কারণে আশপাশের সড়কে গাড়ির চাপ বেড়েছে। এতে যানজটের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশেও সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বহুতল ভবন নির্মাণে উন্মুক্ত স্থান ও সবুজায়ন নিশ্চিত করা শুধু নীতিগত বিষয় নয়, এটি নগর পরিবেশ রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে গাছ সংরক্ষণ বা নতুন গাছ রোপণের শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে বিভিন্ন নথি ও স্থানীয় সূত্রে ওমর খসরু খান, আতিকুর রহমান, বিল্লাল হোসেন ও হোসেন নামের কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রিয়েল এস্টেট খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্ল্যাট বা ইউনিট বিক্রির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল, অনুমোদিত নকশা এবং সরকারি বিধি-বিধান মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ভবিষ্যতে ক্রেতারা আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের দাবি—
- রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণ মিলিয়ে পুনরায় তদন্ত করা।
- শেয়ারিং চুক্তির মাধ্যমে ইউনিট হস্তান্তরের আইনগত বৈধতা যাচাই করা।
- পার্কিং, অগ্নি-নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শর্ত মানা হয়েছে কি না তা পরিদর্শন করা।
- প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা।
- অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে রিয়াজ মোল্লা, সাপোর্ট টু কনভিয়েন্ট লিমিটেড, স্পেস টেন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
(চলবে… তৃতীয় পর্বে: শেয়ারিং কনসেপ্টের আর্থিক কাঠামো, অর্থ লেনদেনের ধরণ, ক্রেতাদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বিশ্লেষণ।)


