দখলকৃত পশ্চিম তীরের আল-রিহিয়া গ্রামের ফিলিস্তিনি গৃহিণী আলিয়া আল-হাল্লাক। গত বছরের অক্টোবরে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে তার নয় বছরের ছেলে মোহাম্মদ নিহত হয়। তবে চার সন্তানের জননী হওয়া সত্ত্বেও তিনি এখনো নিজেকে পাঁচ সন্তানের মা হিসেবেই পরিচয় দেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি-কে তিনি বলেন, ‘ছেলের হারানোর বিষয়টি আমি এখনো মেনে নিতে পারিনি। আমি প্রায়ই বাড়ির উঠানে বসে মোহাম্মদের কবরের দিকে তাকিয়ে থাকি। সন্তানরা যাতে না দেখে, সেভাবে লুকিয়ে চোখের পানি ফেলি।’
তিনি জানান, তাদের গ্রামে টহলরত সেনাদের দেখে ভয়ে দৌড়ে পালানোর সময় মোহাম্মদকে গুলি করা হয়।
মোহাম্মদের চাচা, যার নামও মোহাম্মদ হাল্লাক, এএফপি-কে জানান যে সেনা টহল দল ও একদল বয়স্ক যুবকের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ছোড়া একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে তার ভাতিজা মারা যায়। জরুরি সেবার তথ্য অনুযায়ী, গুলিটি মোহাম্মদের পেট ভেদ করে চলে গিয়েছিল।
মোহাম্মদের মা বলেন, ‘মোহাম্মদের মৃত্যুই আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে।’
ঘটনার সময় এএফপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায় যে, আল-রিহিয়ায় মোতায়েন থাকা সেনাদের সঙ্গে বিরোধের একপর্যায়ে তারা গুলি চালিয়েছিল।
সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, ‘সৈনিকেরা পাথর নিক্ষেপকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সন্দেহভাজনদের গায়ে গুলি লাগার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।’ সাধারণত কাউকে গুলি করে আঘাত করার ক্ষেত্রে তারা এই কথাই বলে থাকে।
গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি বাহিনী কর্তৃক ফিলিস্তিনি শিশু ও কিশোরদের হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বেৎসলেমে’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস গাজা থেকে ইসরাইলে বড় ধরনের হামলা চালানোর পর থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ২৩৫ জন শিশু ও কিশোর নিহত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে নিহত হয়।
ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের ‘কলোনিজম অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন’ নামক একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতে, একই সময়ে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা ২৫০ জন।
বেৎসলেমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যকার ১৭ বছরে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় একজন ফিলিস্তিনি শিশু বা কিশোর নিহত হতো—যা বর্তমানের তুলনায় অনেক কম। তবে ৭ অক্টোবরের পর থেকে বেৎসলেমের হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে প্রায় সাতজন শিশু নিহত হচ্ছে।
পাথরের বিপরীতে বুলেট
৭ অক্টোবরের পর থেকে সন্তান হারানো ১২ জন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে এএফপি। প্রত্যেকের ঘটনার বিবরণ আলাদা হলেও সবার গল্পেই রয়েছে মাঝপথে থেমে যাওয়া পারিবারিক জীবন এবং বিচারহীনতার দীর্ঘশ্বাস।
বেৎসলেমের তথ্যমতে, গত বছর নিহত ৫৪ জন ফিলিস্তিন শিশু বা কিশোরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স ছিল মাত্র দুই বছর এবং সিংহভাগের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
ইসরাইলি বাহিনী যখন ফিলিস্তিনি যুবকদের পাথর ছোঁড়ার জবাবে তাদের ওপর চড়াও হয় এবং গুলি চালায়, তখন প্রায়ই কিশোরেরা নিহত হয়। ফিলিস্তিনি এই যুবকদের সেনাবাহিনী নিয়মিত ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে।
পশ্চিম তীরের ইসরাইলি সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ ২০২৫ সালের শুরুর দিকে জানান যে, সেনাবাহিনী ২০২৫ সালে পাথর ছোঁড়ার অভিযোগে ৪২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, তবে এর মধ্যে কতজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল তা তিনি উল্লেখ করেননি।
মোহাম্মদের মতো ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অন্যান্য কিছু ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে, সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে এবং সেখানে উপস্থিত শিশুদের হত্যা করেছে।
এরকমই একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের জুনে। পশ্চিম তীরের হেব্রন শহরে সাত মাসের শিশু স্যাম আবু হাইকাল ইসরাইলি সৈন্যদের গুলিতে মুখের মধ্যে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়।
শিশুটির মা, ২৮ বছর বয়সি বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষক দানিয়া আবু হাইকাল এএফপি-কে জানান, কোলে থাকা শিশু স্যামকে লক্ষ্য করে সৈন্যরা তাদের গাড়িতে গুলি চালালে তিনিও আহত হন। একটি গুলি তার গাল ভেদ করে কান দিয়ে বেরিয়ে যায়।
বেথেলহেমে নিজেদের বাড়িতে এএফপির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তার মুখে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়। সে সময় তিনি তার মৃত ছেলের একটি ‘খেলনা শেয়াল’ শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘কেউ কেন একটি কোলের শিশুকে গুলি করবে? একটি অবুঝ শিশু, সাত মাসের একটি শিশু সৈন্যদের কী ক্ষতি করেছিল?’
প্রাথমিক তদন্তের পর সেনাবাহিনীর দাবি, সৈন্যদের গাড়ির দিকে দ্রুত এগিয়ে আসার কারণে এক সৈন্য ‘অসম্পৃক্ত বেসামরিক নাগরিকদের’ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। তবে দানিয়া এই দাবি অস্বীকার করে জানান যে, সৈন্যরা গুলি করার আগেই তাদের স্বামী গাড়ি থামিয়েছিলেন।
একমাত্র সন্তান হারানোর গভীর শোকের পাশাপাশি তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন গুলির শারীরিক যন্ত্রণা। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন কাঁদি; ওকে ছাড়া আমার জীবন এখন শূন্য।’
এএফপির সঙ্গে কথা বলা অন্যান্য মায়েরা ঘটনার সঠিক তদন্তের জন্য আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়েছেন। দানিয়া বলেন, ‘ইসরাইলিদের হাতে নিহত হওয়ার পর ফিলিস্তিনিরা কখনো ন্যায়বিচার পায় না। তবুও আমরা আশা করি আমরা ন্যায়বিচার পাবো।’
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন


