চরফ্যাশনে প্রাথমিক শিক্ষায় অনিয়ম

সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি: ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক অনুপস্থিতি, সরকারি উন্নয়ন তহবিলের অর্থের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদায়ন এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। স্থানীয় সূত্র, অভিভাবকদের অভিযোগ এবং অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামত, রুটিন মেইনটেন্যান্স, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, স্লিপ (SLIP) তহবিল এবং ওয়াশ ব্লক (WASH Block) নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে অনিয়ম ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়নের নামে কাগজে-কলমে কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক বিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ১৬৮ নং দক্ষিণ চর আইচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় এক সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে মারধর করে আহত করার অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও অভিযোগ অনুযায়ী কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে উপজেলা সদর বা শহরের নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পদায়ন নিচ্ছেন।

ফলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম এবং বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে অভিযোগ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঠপর্যায়ে বিদ্যালয় পরিদর্শনের পরিবর্তে প্রশাসনিক কার্যক্রম অফিসকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে বিদ্যালয়গুলোতে কী হচ্ছে, তার কার্যকর নজরদারি হচ্ছে না বলেই মনে করছেন তারা।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ক্রাইম পেট্রোল বিডিকে জানান, অনেক শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে না গিয়ে ব্যক্তিগত কাজে সময় ব্যয় করেন। কেউ কৃষিকাজ, কেউ গবাদিপশু পালন, আবার কেউ ব্যক্তিগত ব্যবসায় ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ করেন তারা।

তাদের ভাষায়, শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হওয়ায় শিশুদের মৌলিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো পড়তে বা লিখতে শিখতে পারছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে—এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে কোনো তথ্য জানানো হয় না। ফলে সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না।

শুধু প্রাথমিক নয়, চরফ্যাশনের কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও ভুয়া ও জাল কম্পিউটার সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) তদন্ত করে অভিযুক্তদের সরকারি বেতন-ভাতার অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভিত্তি। সেই ভিত্তি যদি দুর্নীতি, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতায় দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাদের মতে—

  • বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু করা।
  • সরকারি উন্নয়ন তহবিলের স্বাধীন নিরীক্ষা করা।
  • দুর্গম এলাকায় শিক্ষক পদায়নের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা।
  • দুর্নীতির অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • বিদ্যালয়ভিত্তিক বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা।

এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

(অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী পর্বে: বিদ্যালয়ভিত্তিক বরাদ্দের নথি, উপস্থিতি রেজিস্টার, উন্নয়ন তহবিলের ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।)