সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি: বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পরীক্ষা পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (BMEB)। কিন্তু এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে অনিয়ম হলে তা কতটা কার্যকরভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্ন নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
বোর্ডের ওয়েবসাইটে পাঠ্যক্রম, পরীক্ষার নীতিমালা, নিবন্ধন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের দাখিল ও আলিম পরীক্ষার জন্যও পৃথক পরিচালনা নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে।
বোর্ডের দায়িত্ব ও কার্যক্রম: বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ইবতেদায়ি, দাখিল ও আলিম স্তরের শিক্ষা কার্যক্রমে পাঠ্যসূচি, বিষয় কাঠামো, পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন এবং প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এসব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে পরীক্ষার মান বজায় রাখা, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন ও ফলাফল প্রকাশে নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বিধিবিধান অনুসরণ করা বোর্ডের কার্যক্রম মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
২০২৬ সালের ২ আগস্ট বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড দেশের সব বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার বিদ্যমান অ্যাডহক কমিটি বাতিল করে সংশোধিত প্রবিধানমালা অনুযায়ী নতুন কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময়ে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিদ্যমান ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি পুনর্গঠন এবং নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিষয়ে নির্দেশনার খবর প্রকাশিত হয়।
প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও এর বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন কমিটি গঠনে বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, যোগ্য ব্যক্তিরা দায়িত্ব পাচ্ছেন কি না এবং স্থানীয় প্রভাব বা অনিয়মের কোনো অভিযোগ উঠলে তা কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন, উপস্থিতি, বেতন-ভাতা গ্রহণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
প্রদত্ত তথ্যে পটিবলা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার একজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা গ্রহণ এবং প্রায় ৭৮ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন বা সরকারি নথি এখানে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই বিষয়টি প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতা, বেতন-ভাতার নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
মাদ্রাসায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, এমপিওভুক্তি এবং প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে সেগুলোও গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তাকে দায়ী করা যায় না। সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, নির্বাচনপ্রক্রিয়া, অনুমোদনের নথি এবং অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা জরুরি।
ডিজিটাল সেবা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ
শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন, ফরম পূরণ, ভর্তি এবং অন্যান্য সেবা অনলাইনে পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্ভুল তথ্য, নিরাপদ লেনদেন এবং সহজ অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অনলাইন ভর্তি বা ফি জমা দেওয়ার নামে কেউ অবৈধ অর্থ দাবি করলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উচিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি ও বোর্ডের নির্দেশনা যাচাই করা।
একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবায় কোনো ভুল, অতিরিক্ত ফি আদায় বা হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে কি না, সেটিও বোর্ডের সেবার মান মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তদারকি ও জবাবদিহি কতটা কার্যকর?
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম যথাযথ কি না, তা নির্ধারণ করতে শুধু প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দেখলেই চলবে না। বরং দেখতে হবে—
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়মের অভিযোগ কত দ্রুত তদন্ত করা হচ্ছে;
- তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে;
- শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও বেতন-ভাতার বিষয়ে নিয়মিত তদারকি রয়েছে কি না;
- নিয়োগ ও পরিচালনা কমিটি গঠনে বিধিবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না;
- শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে কি না;
- তদন্ত ও নিরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে কি না।
এসব বিষয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য, সরকারি নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ করা গেলে বোর্ডের কার্যক্রমের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে একটি বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
জবাব চায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহল
মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা দেশের শিক্ষা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কাছে তাই প্রশ্ন—প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ যাচাইয়ের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? আর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি কীভাবে জানা যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বোর্ডের সংশ্লিষ্ট শাখা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
সি.পি. ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম, প্রতিষ্ঠান তদারকি, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও আর্থিক জবাবদিহি নিয়ে প্রাসঙ্গিক নথি সংগ্রহ এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখবে।
—অনুসন্ধান চলমান


